গণভোটের একাল-সেকাল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন দেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটার।
স্বাধীনতার পর এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো গণভোট হতে যাচ্ছে দেশে, যেখানে আগের তিনবারই ৮৪ থেকে ৯৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, “আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।”
প্রশ্নে চার প্রস্তাব, জবাব দিতে হবে একসঙ্গে
গণভোটের ব্যালটে যে প্রশ্ন থাকবে, তাতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে চারটি প্রস্তাব থাকবে। কিন্তু এগুলোর আলাদা আলাদা জবাব দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একজন ভোটার ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জবাবের মাধ্যমে চারটি প্রস্তাবের জবাব দেবেন।
ব্যালটে লেখা থাকবে, “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?”

গণভোটে চার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—
ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ. আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষের এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন হবে; সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে।
গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন হবে।
দেশে বর্তমানে ভোটার রয়েছে পৌনে ১৩ কোটির মতো।
সংসদ নির্বাচনের সময় আলাদা ব্যালটে গণভোটের রায় দেবেন ভোটাররা।

আগের তিন গণভোট
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে মতামত নেওয়ার পদ্ধতিই হল গণভোট। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের জন্য উপস্থাপন করা হয়।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোট হয়েছে; ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে।
১৯৭৭ সালের ৩০ মে প্রথম গণভোট হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি জনগণের মতামত যাচাইয়ের জন্য। সেবার ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ ‘না’ ভোট পড়েছিল।
দেশে দ্বিতীয়বার গণভোট হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি আস্থা এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকার বিষয়ে জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেই ভোটে। মূলত সামরিক শাসকের বৈধতা দেওয়ার জন্য সেই গণভোট হয়েছিল। সেবার ৯৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ৬ শতাংশের মতো ‘না’ ভোট পড়েছিল।
সবশেষ গণভোট হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। সংবিধানের ১৪২ (১ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হয় সেই গণভোট। সেবার জনগণের সামনে প্রশ্ন ছিল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধন) বিল, ১৯৯১-এ রাষ্টপতির সম্মতি দেওয়া উচিত কি না? ভবিষ্যতে দেশে কোন ধরনের সরকার পদ্ধতি চলবে, জনগণের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল এ প্রশ্নের মাধ্যমে। সেবার ৮৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং ১৬ শতাংশ ‘না’ ভোট পড়েছিল।