হুজুরদের ‘চাপাতিধারী’ মন্তব্য, ব্যারিস্টার আরমান কে ক্ষমা চাওয়ার দাবি।

একটি সাম্প্রতিক পডকাস্টে ব্যারিস্টার আরমান বিন কাসেম যে মন্তব্য করেছেন, তা শুধু আপত্তিকর নয়—এটি আলেম সমাজকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এক কুৎসিত স্টেরিওটাইপকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি বলেন, পৃথিবীতে কোথাও ‘শরীয়াহ রাষ্ট্র’ নেই। এরপর হাসতে হাসতে যোগ করেন— “হুজুর will come after me with the চাপাতি।” পাশে থাকা আরেক অতিথির অবিবেচক হাসি এই বক্তব্যকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে।
এই মন্তব্য কোনো নির্দিষ্ট উগ্র গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়; বরং ঢালাওভাবে ‘হুজুর’ বা আলেম সমাজকে রক্তপিপাসু ও সহিংস হিসেবে চিত্রিত করার এক কুরুচিপূর্ণ ব্যঙ্গ। প্রশ্ন হলো—হুজুর মানেই চাপাতিধারী, এই বিকৃত ধারণার উৎপত্তি কোথায়? এটি কি বহু আলোচিত শাহবাগী বয়ানেরই পুনরাবৃত্তি নয়?
আলেম সমাজকে অসভ্য, বর্বর বা সহিংস হিসেবে উপস্থাপনের এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সেই ঘরানা থেকেই এসেছে, যারা একসময় ‘বিচার’-এর নামে প্রহসন চালিয়ে ব্যারিস্টার আরমানের বাবাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল এবং পরবর্তীতে তার নিজের গুম হওয়ার পেছনেও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা তৈরি করেছিল। সেই একই ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি আজ একজন ভুক্তভোগীর মুখে ফিরে আসা নিছক ব্যক্তিগত মতামত নয়; এটি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মসমর্পণ।
বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট দেখা যায়, চাপাতি, বন্দুক ও আগুনের রাজনীতিতে তথাকথিত ‘সেকুলার’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ দলগুলোর রেকর্ডই সবচেয়ে ভয়াবহ। দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার সিংহভাগ যেখানে মূলধারার রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোর হাতে সংঘটিত, সেখানে আলেম সমাজকে ‘চাপাতিধারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা চরম অন্যায় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার।
বর্তমান বাস্তবতায় কিছু জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীর মধ্যে নিজেদের ‘সভ্য’ ও ‘লিবারেল’ প্রমাণের এক ধরনের মরিয়া চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, আলেম সমাজকে খাটো করে বা সেকুলার ভাষায় কথা বললে প্রগতিশীল মহলের স্বীকৃতি পাওয়া যাবে। বাস্তবতা হলো, যাদের সন্তুষ্ট করতে এই ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে, তারা কখনোই তাদের আপন করে নেবে না।
২০১৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রশ্নে রাজপথে সবচেয়ে বেশি রক্ত দিয়েছে সাধারণ আলেম ও মাদরাসা ছাত্ররাই। জামায়াত নেতাদের ফাঁসির সময় জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এই সমাজই। অথচ আজ সেই ত্যাগ ভুলে গিয়ে স্টুডিও আলোয় বসে তাদের উপহাসের পাত্র বানানো হচ্ছে—এটি কেবল দুঃখজনক নয়, গভীর কৃতঘ্নতারও পরিচায়ক।
ব্যারিস্টার আরমান বিন কাসেম যে ভয়াবহ দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে গেছেন, তার প্রতি সহানুভূতি স্বাভাবিক ও ন্যায্য। কিন্তু আয়নাঘরের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে যদি তিনি আলেম সমাজকে ‘কলোনিয়াল লেন্স’ দিয়ে দেখতে শুরু করেন, তবে তা ব্যক্তি হিসেবে তার জন্য যেমন অস্বস্তিকর, জাতির জন্যও তেমনি দুর্ভাগ্যজনক।
সাধারণ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—হুজুরদের ‘চাপাতিধারী’ আখ্যা দিয়ে করা এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কৌতুকের জন্য ব্যারিস্টার আরমান বিন কাসেমকে জনসমক্ষে ক্ষমা চাইতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করার নামে আলেম সমাজকে বলির পাঁঠা বানানোর প্রবণতা কারও জন্যই শুভ পরিণতি বয়ে আনবে না।