বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড: ২০২২ সালে চালু করা আওয়ামী লীগ সরকারের ‘স্মার্ট ফ্যামেলি কার্ডের’ সাদৃশ্য!

ঢাকা, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) সম্প্রতি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যা দুর্বল পরিবারগুলোকে মাসিক ২,৫০০ টাকা বা সমতুল্য খাদ্যসামগ্রী প্রদান করবে। তবে এই প্রস্তাবটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালে চালু হওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রোগ্রাম’-এর সাথে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ, যা দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল।
টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সাল থেকে চালু হয়েছে এবং পরবর্তীকালে ডিজিটাইজড করা হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সাবসিডাইজড দামে তেল (২ লিটার ২০০ টাকা), ডাল (২ কেজি ১২০ টাকা) এবং চিনি (১ কেজি ৭০ টাকা) কিনতে পারে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রায় ১ কোটি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, যদিও পরবর্তী সরকারে অনিয়মের অভিযোগে ৩৭ লাখ কার্ড বাতিল করা হয়। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন জানিয়েছেন, “পুরনো পেপার-ভিত্তিক সিস্টেমের পরিবর্তে স্মার্ট কার্ড দিয়ে টিসিবির কার্যক্রম চলবে, যাতে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।” বর্তমানে ৫৭ লাখ কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে, যা নিম্নআয়ের মানুষদের খাদ্য মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা দেয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যামিলি কার্ড প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল দেশের ২৫-৩০ শতাংশ দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদান করা। এর আওতায় এক কোটি পরিবারকে লক্ষ্য করে ৩৮.৫ লাখ অতি-দরিদ্র পরিবারকে কোভিড মহামারীর সময় ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। রমজান মাসে দাম বৃদ্ধির সময় প্রতি পরিবারকে দুবার ৫৫০ টাকা সাবসিডি দেওয়া হয় খাদ্যসামগ্রীর জন্য। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) দুটি প্যাকেজ অফার করত: একটিতে তিনটি পণ্য ৪৬০ টাকায় এবং অন্যটিতে চারটি পণ্য ৫৬০ টাকায়। কার্ডধারীদের পুরো প্যাকেজ কিনতে বাধ্য করা হত।

টিআইবির সমীক্ষা (এপ্রিল-জুন ২০২২-এ সংগৃহীত তথ্য এবং ১৮-২৬ এপ্রিল ২০২২-এ ৩৫ জেলায় সমীক্ষা) দেখায় যে, নগদ সহায়তা প্রাপ্তদের মধ্যে ৪০ শতাংশ কার্ড পাননি, যার ৮০.৪ শতাংশ অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে। ১৪.১ শতাংশ কারণ জানত না। অর্ধেক উপকারভোগী মনে করেন যে অযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কার্ড পেয়েছেন। নথিভুক্তি এবং বিতরণের সময় ৪ শতাংশ কার্ডধারীকে ৫০-২০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। টিসিবি পণ্য কেনার সময় ১৩.৭ শতাংশ অনিয়মের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৩.৩ শতাংশ নিম্নমানের পণ্য পেয়েছেন এবং প্যাকেট ছিঁড়ে ১০০-২০০ গ্রাম কম দেওয়া হয়েছে। গড়ে ১.২ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে, সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত, যা দরিদ্রদের দৈনিক আয়কে প্রভাবিত করেছে।
বঞ্চিতদের মতে, বাদ পড়ার প্রধান কারণগুলো ছিল তালিকা প্রস্তুতির স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক কারণে নথিভুক্তি, একই পরিবারে একাধিক কার্ড এবং ঘুষ না দেওয়া। অভিযোগগুলো মূলত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ৪.৭ শতাংশ কার্ড নির্ধারিত কমিটির বাইরের ব্যক্তিদের কাছ থেকে পেয়েছেন, যা নিয়মবিরুদ্ধ। অনিয়মের শিকার ৮৯.৯ শতাংশ অভিযোগ করেননি বা করতে পারেননি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন। টিআইবির সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে: দরিদ্রদের মতামত নিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করা, পণ্যের ধরন এবং দাম নির্ধারণে চাহিদা মূল্যায়ন, বিক্রয়স্থলে তথ্য প্রদর্শন এবং ছোট পরিমাণে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা।
বিএনপির প্রস্তাবটি এই প্রকল্পের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও, এতে অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত করার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে অতীতের দুর্নীতির ছায়া বিবেচনায়, বিশ্লেষকরা বলছেন যে নতুন প্রকল্প চালুর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৬ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা আরও তীব্র হতে পারে।