সর্বশেষ
Live Bangla Logo

গভীর রাতে হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করতেন এক-এগারোর কুচক্রীরা

প্রকাশিত: ৩০ মার্চ, ২০২৬
গভীর রাতে হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করতেন এক-এগারোর কুচক্রীরা

বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন (১/১১ সরকার) সরকারের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে সমঝোতা করতে রাতের আঁধারে গোপনে মিটিং করত ওই সরকারের কুশীলবরা। শেখ হাসিনার কারামুক্তির আগ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে মাঝেমধ্যেই গোপনে মিটিং হতো তার সঙ্গে। মিটিংগুলো সমন্বয় করতেন ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এটিএম আমিন। ভারতের পরিকল্পনায় ১/১১ সরকারের প্রধান কুশীলব সাবেক সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ ও ফখরুদ্দীন আহমদের পক্ষ থেকে এটিএম আমিন সমন্বয় করতেন বলে রিমান্ডে তথ্য দিলেও গোপন মিটিংগুলোতে অংশ নিতেন না বলে দাবি করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। নির্ভরযোগ্য-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।


মাসুদ চৌধুরীকে পল্টন থানার মানবপাচার মামলায় প্রথম দফায় পাঁচদিনের রিমান্ড শেষে গতকাল রোববার ফের ছয়দিনের রিমান্ড আদেশ দিয়েছে আদালত। এদিন ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এ আদেশ দেয়। এর আগে তাকে প্রথম দফায় পাঁচদিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রায়হানুর রহমান তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।


অন্যদিকে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আরেক কুচক্রী ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদ রিমান্ডে নানারকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার পর এখন ঘুরেফিরে একই কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে (১/১১ সময়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব) নিয়ে রিমান্ডে মামুন খালেদ বলেছেন, ২০০৭-০৮ সালের ১/১১ সরকারের সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তার কারামুক্তির বিষয়েও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন বলে দাবি করেন।


গত ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মামুন খালেদকে। পর দিন তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। আজ ৩০ মার্চ তার পাঁচদিনের রিমান্ড শেষ হবে। তাকে দ্বিতীয় দফায় আবারও রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১১-২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক থাকাকালীন মামুন খালেদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ, রাজনীতিক ও বরেণ্য সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।


সেনা কর্মকর্তাদের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ার পর দুর্নীতির মাধ্যমে এক হাজার এক কোটি ৪০ হাজার টাকা নয়ছয়ের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ১/১১ সরকারের সময় চাঁদাবাজির মাধ্যমে কয়েকশ কোটি টাকা নিয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তাদের জেরার মুখে মামুন অর্থ লোপাটের কথা অস্বীকার করেন।



এদিকে প্রথম দফা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে ১/১১ সরকারের সময় তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্নে মাসুদ চৌধুরী বলেন, তারা বিএনপি, জিয়া পরিবার ও তারেক রহমানের পক্ষে কাজ করেছেন। পাশাপাশি তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন চালানোর বিষয়ে অন্য কর্মকর্তাদের ওপর দোষ চাপানোর পুরোনো কথাই ঘুরেফিরে বলেছেন। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ চৌধুরী বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (‘র’)-এর নাম বলেছিলেন। তাদের সহযোগিতা করেন তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি পরিকল্পনা শুরু করে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষদিকে। এদের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ব সংস্থাটির নামে ভুয়া চিঠি তৈরি করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তৎকালীন সেনাপ্রধান বিএনপির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। 


বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে মাইনাস করে ২০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করে ১/১১ সরকার। গত ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।


মাসুদ তদন্তসংশ্লিষ্টদের জানান, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিএনপি সরকারের শেষদিকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে জামায়াত-শিবিরের চারজন নেতাকর্মীকে লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করে পরিকল্পনার সূচনা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে চায় নিশ্চিত হয়ে পরিকল্পনা সাজানো হয়। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিপরীতে ভিন্ন ধরনের সরকার গঠনের ভারতীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ ধরনের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। এ ফাঁদে পা দিয়ে দেশে ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদের সরকার হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন বিএনপির নিয়োগ দেওয়া সে সময়ের সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ এবং সাভারের ৯ম ডিভিশনের জিওসি মাসুদ উদ্দিন। ওয়ান-ইলেভেনের পেছনে কর্নেল (অব.) অলির যোগসাজশ রয়েছে বলেও দাবি করেন রিমান্ডে থাকা মাসুদ চৌধুরী। এছাড়াও বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে মাসুদ উদ্দিন তার ‘ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ও তার সহযোগীরা প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে এখনো কিছু স্বীকার করেননি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের মামলা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ মামলা তদন্ত করছে।