অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গোপন চুক্তির কারণে রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হচ্ছে: দেবপ্রিয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গোপন চুক্তির কারণে রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হচ্ছে—এমন দাবি করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান জ্বালানি ধাক্কা এমন এক নীতিগত পরিবেশে ঘটছে, যেখানে সরকারের কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংলাপের আয়োজন করে সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশ।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির কিছু বিধান দেশের জ্বালানি আমদানি কৌশলকে সীমাবদ্ধ করছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা সমন্বয় ও ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ সংক্রান্ত ধারার কারণে তুলনামূলক কম দামের উৎস—যেমন রাশিয়া—থেকে তেল কিনতে আনুষ্ঠানিক ছাড় নিতে হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার সময় বাংলাদেশের ক্রয়-সুবিধা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকট একযোগে রাজস্বনীতি, বৈদেশিক খাত ও মুদ্রানীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–এর সংস্কার শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং একই সঙ্গে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বজায় রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি, যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান। এতে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য অস্থিরতার দিকেও ইঙ্গিত করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক ওই অঞ্চল থেকে আসে, ফলে সেখানে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার কঠিন নীতিগত দ্বিধায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজস্ব সুরক্ষায় জ্বালানি কর কাঠামো বজায় রাখা হবে, নাকি ভোক্তাদের চাপ কমাতে তা হ্রাস করা হবে—এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড–এর প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে, যেমন জেট ফুয়েলে, মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক দামের পূর্ণ প্রভাব দেশীয় বাজারে প্রয়োগ করলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ কমে বর্তমানে জিডিপির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা ও ব্যয় বৃদ্ধি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতির ওপর জোর দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, রাজস্ব শৃঙ্খলা, বৈদেশিক স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় না করা গেলে পরিস্থিতি বড় ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।