ইরান যুদ্ধে তিন বিরোধীর রাজনীতি ও সময়ের দৌড়

আমেরিকা, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে গালফ এলাকা্ নিয়ে চলছে এক ঘনিষ্ট সঙ্ঘাত, যেখানে শুধু অস্ত্র আর যুদ্ধ নয়, সময়ের নিয়ন্ত্রণই এক ধরণের যুদ্ধের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এই তিন বড় খেলোয়াড় প্রত্যেকেই আলাদা রাজনৈতিক সরঞ্জাম ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত সমঝোতার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছিলেন, যুদ্ধ নয়। তিনি আশা করেছিলেন মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে শানযুক্ত আঘাত ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে পতনের মুখে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম হল। দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে আমেরিকার সময় কমে আসছে এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম তুঙ্গে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, যা তার নির্বাচনী প্রার্থনাকে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। মধ্যাম মেয়াদের নির্বাচনের ঠিক সাত মাস আগে এই ঝামেলা রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
অপরদিকে, ইরান এখন মূলত ধৈর্যের উপরই নির্ভর করছে। যুদ্ধে তার নেতাদের নিহত হওয়া, পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে আঘাত এবং অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও সরকার পতনের গুজব অধরা থেকে গেছে। ইরানের বিস্তৃত ভূখণ্ড এবং প্রকৃতির কারণে দ্রুত সিদ্ধান্তমূলক আঘাত দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরানের দিকে রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলে জোর দিয়ে তারা আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে টিকে থাকতে চাইছে যাতে আমেরিকার অভ্যন্তরীন চাপ বৃদ্ধি পায়। ইয়েমেনের মতো ঘটনায় স্থলপথের বলপ্রয়োগ সীমিত হলেও হরমুজ প্রণালীর বন্ধ থাকাটা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও মূল্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ইরান জানে, যতক্ষণ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকবে, ততক্ষণ তার টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসরায়েলের অবস্থান আরও জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যার বিরুদ্ধে দেশীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলা চলছে, তিনি মূলত যুদ্ধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। যুদ্ধের পরিবেশ তাঁর তথা তাঁর দলের বিরোধীদের সমালোচনা মুছে দেয়, জাতিকে একত্রিত করে এবং দীর্ঘদিন থেকেই লেবানন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইজরায়েলের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করে। এমনকি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সামরিক বন্ধ ঘোষণা সত্ত্বেও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে লেবাননের ব্যাপারে রণবিরতি প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। দেশের মধ্যে যুদ্ধমুখী মনোভাব ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এবং সাধারণ জনতা প্রাধান্য দিচ্ছে সামরিক সমাধানের ওপর কূটনীতি পরিচালনার পরিবর্তে। নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য একধরনের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, যা করার জন্য তিনি যেকোনো রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
সংঘাতের এই তিন প্রধান পক্ষের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টাইমলাইন একেবারেই আলাদা। ট্রাম্পের জন্য সময়সীমা সংকীর্ণ, ওই বছরের নভেম্বরের নির্বাচন তা নির্ধারণ করবে। ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সময় নেয়া ও আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সংকটগুলোকে দীর্ঘায়িত করার উপরে ভরসা রাখছে। আর নেতানিয়াহু এর বিপরীতে যতক্ষণ সম্ভব যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে চায় যাতে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় হয় ও পার্টি বড় আসন পায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান যুদ্ধে সক্ষমভাবে টিকে থাকায় আপাতত জয়ী অবস্থানে রয়েছে। আমেরিকা একপ্রকার সময়ের সঙ্কটে উত্তম সমাধান খুঁজছে। আর ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ রেখে আঞ্চলিক ক্ষমতা বিস্তারের পক্ষে। সামগ্রিকভাবে, এই সংঘাতের আসল জয়ী সময়ই হতে পারে, কারণ সময়কে কোনো বোমা, নিষেধাজ্ঞা বা ছলনা দিয়ে আটকানো যায় না। ভবিষ্যতের সুস্থিতি ও শান্তির রাস্তা যারা এই বাস্তবতাকে বুঝবেন এবং রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা দেখাবেন, তারাই শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবেন।