ইরান-আমেরিকা সংঘর্ষের পঞ্চাশতম দিনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি ও সমুদ্র পথে নতুন বাধা

ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ পঞ্চাশ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। এ সময়কালে দুদেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষত হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক ঘটনায় ইরান আবারও হরমুজের স্রাতটি বন্ধ ঘোষণা করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের বন্দরের প্রতি ব্যবহৃত নাবিকীয় অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চালু থাকবে বলে জানানো হয়।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ব্যাপারে কিছু আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন এবং বলা হয়েছিল যে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতার পথ খুলেছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা এই আশাবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে বলছেন, তারা ইউরেনিয়ামের সম্পর্কিত বিতর্কে কোনো আপস করবে না এবং বর্তমানে আলোচনা চলাকালে গভীর অনুমানবাদের সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ইউরেনিয়ামের উত্তোলিত ষ্টক কোথাও সরিয়ে নেওয়া হবে না এবং এর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে। এছাড়াও, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পারাপারের জন্য তারা পণ্যের জন্য প্রচলিত ট্রানজিট ফি ধার্য করবে না, বরং প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে যা জাহাজ মালিকদের থেকে ফি আদায় করবে। তবে এই প্রণালী দিয়ে চলাচল সুনির্দিষ্ট সমন্বয় ও অনুমতির আওতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, বিশেষ করে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক জাহাজের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ থাকবে।
এই আবহে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিও অস্বাভাবিক তাসের মতো চলছে। লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর লেবাননের রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউন বলেছেন যে দেশটি নতুন একটি স্থায়ী শান্তির পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে এবং অন্যত্রের যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রবিন্দু আর হবে না।
একই সময়ে, ফ্রান্স ও ব্রিটেন হরমুজ প্রণালীর নাবিকীয় নিরাপত্তার জন্য বহুজাতিক একটি অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভবিষ্যতে চীনের রাষ্ট্রপতির সাথে একটি ঐতিহাসিক সফর হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। যেমেনে ইরানের সাথে সমর্থনশীল হুথি বিদ্রোহীরা লেবাননকে সামরিকভাবে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান পরিস্থিতিকে আদতে সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে বলে উল্লেখ করে স্বাগত জানিয়েছেন হরমুজ প্রণালীর পুনরায় উন্মুক্তি। তারা দ্রুত ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম, তবে কিছু দেশ এখনও প্রস্তুত হতে সময় লাগবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিছু দেশকে সাময়িকভাবে অব্যাহত রাখতে একটি বিশেষ অনুমতি বাড়িয়েছে এবং ইরানের বন্দরের উপরে ক্রমাগত নাবিকীয় অবরোধ সংক্রান্ত কার্যক্রমও চলছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২১টি জাহাজ ইরানি বন্দরের দিকে যাওয়া থেকে ফিরে এসেছে। ট্রাম্প বলেন যে আলোচনা ভালো যাচ্ছে, কিন্তু চুক্তি ছাড়া যুদ্ধবিরতি বাড়ানো কঠিন হবে। তিনি ইরানের ইউরেনিয়াম হাতে সোপর্দ করার দাবী করেন, যখন ইরান তা বাতিল করেছে।
ইসরায়েল ও লেবাননের উত্তেজনা এখনও অব্যাহত থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে লেবাননে আক্রমণ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন যে যুদ্ধ শেষ হয়নি এবং হেজবোল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, লেবাননের দক্ষিণে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় একজন নিহত হওয়ার খবর রয়েছে, যা চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মাঝেও সংঘটিত হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, মার্চ মাস থেকে এই সংঘর্ষে প্রায় ২৩শ মানুষ নিহত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনোনীত করছেন যে এই সংঘাত মূলত একটি দীর্ঘদীর্ঘ পশ্চিমা আধিপত্য বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ এবং এটি সামরিক উত্তেজনা থেকে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ধাবিত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এই সংঘাতের প্রভাবও প্রকাশ পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী খোলা থাকায় তেলমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসছে এবং ওয়াল স্ট্রিটে বাণিজ্য সান্ত্বনা পাচ্ছে। একই সঙ্গে, বোম্ব্রিংয়ের প্রতিরক্ষা খাত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা যাত্রীবাহী বিমান খাতে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির ক্ষতি কিছুটা প্রশমিত করতে সহায়তা করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানা চাপে থাকা মধ্যপ্রাচ্য, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং অর্থনীতি পরবর্তী নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা এবং সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি একসাথে বিদ্যমান।