অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের 'সমকামী অধিকার অধ্যাদেশ' : পশ্চিমা এজেন্ডার দাসত্বে মুসলিম সংস্কৃতির ধ্বংস?

ধর্মীয় নেতাদের তীব্র প্রতিবাদ, সমাজবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন
ঢাকা, ১৩ অক্টোবর ২০২৫: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাম্প্রতিক 'সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন অ্যান্ড জেন্ডার আইডেনটিটি অর্ডিন্যান্স' জারির ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঝড় তুলেছে। এই অধ্যাদেশকে সরকার 'সমকামিতা এবং ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের আইনি সুরক্ষা' হিসেবে উপস্থাপন করলেও, ধর্মীয় নেতা, সমাজবিজ্ঞানী এবং রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো এটিকে 'পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন' এবং 'ইসলামী মূল্যবোধের উপর চড়বড়ানি' বলে সমালোচনা করছেন। মুসলিম-প্রধান দেশে এমন একটি পদক্ষেপ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (ইন্টারিম গভর্নমেন্ট) অ-ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জনগণের মতামতের প্রতি অসংবেদনশীলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অধ্যাদেশটি ১০ অক্টোবর জারি হয়েছে, যা সমকামী সম্পর্ককে কার্যকরভাবে অপরাধমুক্ত করে এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের লিঙ্গ পরিবর্তনের আইনি স্বীকৃতি প্রদান করে। সরকারের দাবি, এটি 'মানবাধিকারের অগ্রগতি' এবং 'আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিক্রিয়া'। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এটি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত এই সরকারের 'পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সমঝোতার' ফল, যা দেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সমাজকে বিপন্ন করছে। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার, যা ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, এখন রক্ষণশীল ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে জোট গড়ে তুললেও এমন একটি 'কৌশলগত' পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করছে। 10 13
বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল্লাহ বিন ইউসুফ বলেছেন, "এই অধ্যাদেশ ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিরোধী। কুরআন এবং হাদিসে সমকামিতাকে গুরুতর পাপ বলা হয়েছে। সরকার কেন পশ্চিমা লবির দাস হয়ে আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে? এটি জিহাদের বিরুদ্ধে আত্মসমর্পণ!" তিনি আরও যোগ করেছেন যে, দেশের ৯০ শতাংশ মুসলিম জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে এমন আইন জারি করা 'অ-গণতান্ত্রিক' এবং 'সাংস্কৃতিক আগ্রাসন'। একইভাবে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির শাফিকুর রহমান বলেছেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই পদক্ষেপ দেশকে সিরিয়া বা আফগানিস্তানের মতো অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা রাস্তায় নামব যদি এটি না ফিরিয়ে নেওয়া হয়।" 14
সমাজবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রেহমান হোসেন বলছেন, "বাংলাদেশের সমাজ এখনও সমকামিতা বা ট্রান্সজেন্ডারিজমকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। ২০২৪-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ বাংলাদেশী এগুলোকে 'পাপ' বা 'মানসিক রোগ' বলে মনে করে। সরকারের এই 'কৌশলগত' অধ্যাদেশ শুধু আন্তর্জাতিক সাহায্য বা ঋণের বিনিময়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এতে সমাজে হিংসা এবং বিভেদ বাড়বে।" তিনি উল্লেখ করেছেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এবং এখন ইউনুস সরকারের এই চাল 'পশ্চিমা এনজিওদের প্রভাবে' হয়েছে। 11 12
এই অধ্যাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। ঢাকার শাহবাগে গতকাল এক ধর্মীয় সমাবেশে হাজারো মানুষ 'ইসলাম বাঁচাও, সমকামিতা বন্ধ করো' স্লোগান দিয়ে মিছিল করেছে। চট্টগ্রাম এবং সিলেটে মাদ্রাসা ছাত্ররা ক্লাস বয়কট করেছে, বলছে যে এটি 'যুবকদের বিপথগামী' করবে। ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টির এক নেতা সারজিস আলম সম্প্রতি ফেসবুকে লিখেছেন, "এই সমকামী অধিকার 'সমাজের ক্যান্সার'। এটি মানসিক অসুস্থতা, এবং সরকার কেন এটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে?" এই মন্তব্যের জন্য তাকে সমালোচনা করলেও, এটি সরকারের নীতির প্রতি জনগণের ক্ষোভের প্রতিফলন। 12
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) এর মতে, এই অধ্যাদেশ সত্ত্বেও সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা আরও বেশি হুমকির মুখে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৬টি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে একটি খুনের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। সংস্থাটি বলছে, "সরকারের এই 'অধিকার' শুধু কাগজে, বাস্তবে এটি ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হাতে অস্ত্র দিচ্ছে।" কিন্তু সমালোচকরা জোর দিয়ে বলছেন যে, এই অধ্যাদেশই হিংসা বাড়িয়েছে, কারণ এটি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। 16 3
বিশ্লেষকদের মতে, এই অধ্যাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অস্থিরতার প্রতীক। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর গঠিত এই সরকার, যা ২০২৬-এর নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এখন রক্ষণশীল দলগুলোর সাথে জোট করে থাকলেও এমন পদক্ষেপ নিয়ে নিজেরাই বিপদ ডেকে এনেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, "সরকার মানবাধিকারের নামে পশ্চিমা চাপে বাধ্য হয়ে এটি করেছে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়েছে।" 18 এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করতে পারে, যেখানে ধর্মীয় দলগুলো এটিকে নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।
সরকার এখনও কোনো অফিসিয়াল প্রতিক্রিয়া জানায়নি, কিন্তু প্রতিবাদের তীব্রতা দেখে মনে হচ্ছে, এই অধ্যাদেশ ফিরিয়ে নেওয়া ছাড়া শান্তি ফিরবে না। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে ইসলাম জাতীয় পরিচয়ের অংশ, এমন 'অধিকার' জারি করা কি সত্যিই অগ্রগতি, নাকি সাংস্কৃতিক আত্মহত্যা? এ প্রশ্ন এখন দেশের প্রত্যেকের মনে জাগছে।