সার্কিট হাউসের করিডোরে সাদা কাপড়ে ঢাকা জিয়ার লাশ পড়ে ছিল- তৎকালীন ডিসি।

১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী তৎকালীন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণা তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের পটোম্যাকে নিজ বাসভবনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সেই ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রবেশ করেই তিনি দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন দেশের রাষ্ট্রপতি—যে দৃশ্য তিনি আজও ভুলতে পারেননি।
জিয়াউদ্দিন জানান, ভোররাত চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে সার্কিট হাউস আক্রমণ করে একদল সেনা কর্মকর্তা, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন লে. কর্নেল মতিউর রহমান, লে. কর্নেল মাহবুব ও লে. কর্নেল ফজলে হাসান। মতিউর রহমান নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেন প্রেসিডেন্ট জিয়াকে। আক্রমণের কিছুক্ষণের মধ্যেই মতিউর ও মাহবুব চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে সেনাসদস্যদের গুলিতে নিহত হন।
তৎকালীন ডিসির বর্ণনায়, সার্কিট হাউসের করিডোরে সাদা কাপড়ে ঢাকা জিয়ার লাশ পড়ে ছিল। তার মুখের এক পাশ গুলিতে উড়ে গিয়েছিল। পাশে দাঁড়ানো এক প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড তাকে নিশ্চিত করেন, “এটাই প্রেসিডেন্ট জিয়ার লাশ।” ভবনের একটি অংশ গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত, গাড়িবারান্দায় রক্তের দাগ ও পড়ে থাকা দুই সেনাসদস্যের দেহ—সব মিলিয়ে ছিল আতঙ্ক আর বিভীষিকার দৃশ্য।
জিয়াউদ্দিন বলেন, “মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও আমরা ছিলেনাে একজন সুস্থ, হাস্যোজ্জ্বল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। রাতারাতি এমন একটি পরিস্থিতি আসবে—ভাবতেই পারিনি।”
প্রেসিডেন্টের এই সফরের কারণ হিসেবে তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিএনপির দুই গ্রুপের কোন্দল মেটাতেই জিয়া এসেছিলেন। তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন ও ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদের অনুসারীদের সংঘাত নিরসনে ২৯ মে রাতে গভীর পর্যন্ত বৈঠক করেন জিয়া। বৈঠক শেষে তিনি সার্কিট হাউসে ঘুমাতে যান, কিন্তু ভোর হতেই ঘটে যায় সেই হত্যাকাণ্ড।
হত্যাকাণ্ডের পর মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে দায়ী করা হলেও, জিয়াউদ্দিন বলেন, “মঞ্জুর আগেভাগে কিছু জানতেন না। সকালে খবর পেয়ে হতবাক হয়ে বলেন, ‘হোয়াট দে হ্যাভ ডান!’” তার ভাষায়, মঞ্জুর ও জিয়া ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তবে সেনাপ্রধান না করায় মঞ্জুরের মনে ক্ষোভ জন্মেছিল।
জিয়াউদ্দিন তার বই Assassination of Ziaur Rahman and Aftermath-এ উল্লেখ করেছেন, জিয়া হত্যাকাণ্ড ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, যেখানে সেনাবাহিনীর ভেতরের কিছু অংশসহ দেশি-বিদেশি পক্ষের জড়িত থাকার ইঙ্গিত মেলে। তার মতে, তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—কারণ ঘটনার আগে এরশাদ চট্টগ্রাম সফর করেছিলেন এবং হত্যাকারী কর্নেল মতিউর ঘটনার ঠিক আগে ঢাকায় এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
জিয়াউদ্দিন মনে করেন, জেনারেল মঞ্জুরকে পরবর্তী সময়ে হত্যা করাও এই ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। তার মতে, “এরশাদ এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছিলেন—জিয়াকে সরিয়ে নিজের ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করেছেন, আর মঞ্জুরকে বলির পাঁঠা বানিয়েছেন।”
সাক্ষাৎকারের এক আবেগঘন অংশে তিনি বলেন, “২৯ মে জুমার নামাজে প্রেসিডেন্টের পাশে ছিলাম চন্দনপুরা মসজিদে। রাতে চট্টগ্রাম ক্লাব থেকে আনা তার প্রিয় খাবার—তন্দুর রুটি, ডাল আর কাবাব খেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘খাবার সুস্বাদু হয়েছে।’ কে জানত, সেটিই তার জীবনের শেষ রাত।”
জিয়াউদ্দিনের ভাষায়, “জিয়া ছিলেন কঠোর কিন্তু সোজাসাপ্টা, সততার প্রতীক এক মানুষ। তার শত্রুরাও তার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেনি।”
এই সাক্ষাৎকারে প্রকাশ পায় ৪৪ বছর আগের সেই ভয়াবহ রাতের প্রত্যক্ষদর্শী এক প্রশাসকের দগ্ধ স্মৃতি—বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এক জীবন্ত দলিল।