নরসিংদীর এসপি পদায়নে ৫০ লাখ টাকার ঘুষ: তদন্তে প্রমাণিত, শাস্তি শুধু ‘তিরস্কার’!

বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল হান্নান নরসিংদীতে পুলিশ সুপার (এসপি) পদায়নের জন্য ২০২৩ সালে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন—বিভাগীয় তদন্তে এমন প্রমাণ মিললেও তাঁকে মাত্র ‘তিরস্কার’ দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ২০২৩ সালে পদায়ন বাস্তবায়িত না হলেও গত বছরের ৯ নভেম্বর তিনি নরসিংদীর এসপি হিসেবে যোগ দেন। যোগদানের পর তিনি ও তাঁর অধীন ডিবি ইনচার্জ এস এম কামরুজ্জামান ঢাকায় গিয়ে কথিত রবিউল মুন্সীর অফিস থেকে পাঁচ লাখ টাকা ফেরত নেন। বাকি ৪৫ লাখ টাকার জন্য স্বহস্তে লিখিত দলিলও নেন তাঁরা। পরে সাংবাদিক নেছারুল হক খোকনের সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় মামলা শেষে গত রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাঁকে ‘তিরস্কার’ দণ্ড দেওয়া হয়। তবে এ লঘুদণ্ড নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা—প্রভাবশালী মহলের নীরব সমঝোতার ফলেই তিনি বেঁচে গেছেন। বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের গুঞ্জনও রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও তিরস্কার দণ্ড আসলে পুরস্কারের শামিল। ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পদায়ন নেওয়া সম্পূর্ণ ফৌজদারি অপরাধ। দুদককে মামলা করা উচিত ছিল।”
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এটা ৫০ লাখ টাকার ঘুষ নয়, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ব্যবসা-সংক্রান্ত লেনদেন। আমার বিবেক অনুযায়ী শাস্তি দিয়েছি।”
তাঁর সই করা প্রজ্ঞাপনে ‘ঘুষ’ শব্দটি উল্লেখ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন—“হয়তো অফিসারদের ভুল হয়েছে।”
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়ার মতে, “ঘুষ একটি বড় সামাজিক অপরাধ। তবে সরকারি চাকরি আইনের ফাঁকফোকরের কারণে এমন ঘটনায় তিরস্কার দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এতে ঘুষকে উৎসাহিত করা হয়।”
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ওএসডি হওয়া অনেক বিতর্কিত কর্মকর্তাকে ফের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার তৎপরতা চলছে বলেও জানা গেছে। পুলিশ, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও কারাগারে বদলি–পদায়নের বাণিজ্য আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে একাধিক সূত্র।
তদন্তে ঘুষের ঘটনা স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও ‘তিরস্কার’—এমন সিদ্ধান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে: “এ কি শাস্তি, নাকি ঘুষ বাণিজ্যের বৈধতা?”