ডেইলি স্টারকে পাল্টাজবাব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব।

ডেইলি স্টারের জবাবের বিষয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।
তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামের বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় ডেইলি স্টারের নাতিদীর্ঘ জবাবটি আমাদের নজরে এসেছে। যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধান ছাড়া পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে ডেইলি স্টার ও তাদের সিন্ডিকেটের অপর পত্রিকা প্রথম আলোর ছাপানো জঙ্গি বিষয়ক কোনো কোনো রিপোর্ট সাজানো জঙ্গি মামলার ভুক্তভোগী ভিন্নমতাবলম্বী কিছু আলেম ও ধর্মপ্রাণ তরুণের বিরুদ্ধে আদালতে কথিত ‘তথ্যপ্রমাণ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের জঙ্গি মামলা নিঃসন্দেহে স্পর্শকাতর বিষয়। বিশেষত ভিন্নমতাবলম্বীদের টার্গেট করে মিথ্যা জঙ্গি মামলায় ফাঁসিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। সেই অমানবিক পরিস্থিতি নিশ্চয়ই ডেইলি স্টারের অজানা ছিল না। ফলে জঙ্গি মামলায় ফাঁসানো কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন বিপদে না পড়েন—সেজন্য ডেইলি স্টারের পেশাগত কর্তব্য ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার অধীন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বা ভাষ্য হুবহু ছাপানোর আগে যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধান করা। কিন্তু সেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে ডেইলি স্টার ও তাদের সিন্ডিকেটের অপর পত্রিকাটি। ইতোমধ্যে হাসিনার আমলে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নিরপরাধ মানুষদের গুম ও হত্যার প্রমাণগুলো তদন্তে একে একে বেরিয়ে আসছে।
আমরা অবাক হয়েছি, সব মিডিয়াও একই কাজ করেছে দাবি করে ডেইলি স্টার তার দায়িত্বহীনতা জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছে। অথচ কিছু দায়িত্বশীল মিডিয়া এজেন্সির বানানো সেসব তথ্য বা প্রেসক্রিপশন ছাপায়নি। আজ থেকে প্রায় নয় বছর আগে উপস্থাপিকা মুন্নী সাহার এক টকশোতে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার সম্পাদকীয় জীবনের ‘বিরাট ভুল’ স্বীকার করেন যে, তিনি ওয়ান ইলেভেনের সময় একটি গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহকৃত তথ্যগুলো কোনো ভেরিফিকেশন ছাড়াই ছাপিয়েছিলেন—যেগুলো টার্গেটেড শীর্ষ কয়েকজন রাজনীতিবিদকে ‘ভিকটিম’ বানাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। তখনো তিনি অন্য সব মিডিয়াও একই কাজ করেছিল বলে নিজেকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ওয়ান ইলেভেনের সময়েও কিছু মিডিয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে এজেন্সির সেসব গার্বেজ ছাপায়নি।
যাই হোক, ডেইলি স্টার তাদের জবাবে হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ উল্লেখ করায় পত্রিকাটিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বিজয় বলেও আমরা মনে করছি। কারণ গত বছরের গণঅভ্যুত্থানকালে ডেইলি স্টার সম্পাদক ২৬ জুলাই পত্রিকাটিতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পক্ষে ‘‘ভুল থেকে শিক্ষা নেবো, নাকি বারবার ভুল করে যাব?’’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলেন। সেই কলামে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দমন বা হত্যাযোগ্য করে তোলার স্পষ্ট বয়ান আছে। খুব সম্ভবত কোনো সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির আনুকূল্যের কারণে এখনো তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের গণঅভ্যুত্থানের অন্তর্বর্তী সরকার।
যাই হোক, হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে ডেইলি স্টারের ছাপানো বেশ কিছু রিপোর্ট আমরা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের স্বার্থে দু’ভাগে বিভক্ত করেছি। একভাগে আমরা দেখেছি, হেফাজতের সমাবেশ ও মিছিলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিত সন্ত্রাসী ও পুলিশবাহিনীর গুলি ও হামলা মোকাবেলায় আমাদের নেতাকর্মীদের ন্যায্য প্রতিরোধকে ‘তাণ্ডব’ আখ্যা দিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া-ফ্রেমিং করেছে ডেইলি স্টার ও তাদের সিন্ডিকেটের অপর পত্রিকাটিও। এভাবে তাদের হলুদ সাংবাদিকতা হেফাজতের প্রতিবাদী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নানা সময়ে দমনযোগ্য ও হত্যাযোগ্য করে তুলতে সম্মতি উৎপাদনে ভূমিকা রেখেছিল।
অপর দিকে, দ্বিতীয় ভাগের রিপোর্টগুলোতে হেফাজতে ইসলামকে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট সংগঠন হিসেবে ফ্রেমিং করার কসরত আমরা দেখেছি। কখনো পুলিশ, কখনো সিটিটিসি, আবার কখনো গোয়েন্দা সংস্থার কথিত বক্তব্যকে মুখ্য করে রিপোর্টে হেফাজতকে জঙ্গিবাদী ফ্রেমিং করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে ডেইলি স্টার। ওয়ার অন টেরর প্রজেক্টের কাজ তো এটাও!
২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ডেইলি স্টার ও তাদের সিন্ডিকেটের অপর পত্রিকা প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার পুরোটাজুড়ে পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার জন্মদিন ও তার গুণকীর্তনমূলক প্রোমোশন ছিল, যা তখন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। অথচ কৌতুককর ব্যাপার হলো, ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইটের শেষ নামফলকের নিচে স্লোগান: “Journalism without fear or favour’’।
ডেইলি স্টার তাদের জবাবে নিজেদের ওপর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের নানা চাপ ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছে। কিন্তু ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওপর বর্বর গণহত্যা (মাস কিলিং) থেকে শুরু করে পুরো ফ্যাসিস্ট আমলজুড়ে আমরা অনির্বচনীয় দমন-পীড়ন ও জেল-জুলুমের শিকার হলেও মার্জিনালাইজড গোষ্ঠী হিসেবে আমাদের প্রতি ডেইলি স্টার বা প্রথম আলো কোনো নিরপেক্ষ আচরণ করেনি। আমরা বরং দীর্ঘসময় তাদের এজেন্ডা সাংবাদিকতার ভিকটিম হয়েছি।
আমরা প্রধানত দ্বীনি স্বার্থে আন্দোলন করি। সে কারণে কোনো মিডিয়ার এজেন্ডা সাংবাদিকতা যখন আমাদের দমনযোগ্য ও হত্যাযোগ্য করে তুলতে ভূমিকা রাখে, তখন সেটিকে আমরা সর্বোপরি ইসলামবিদ্বেষী ফ্রেমিং হিসেবেই দেখি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনোভাবেই বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে নয়। ডেইলি স্টার ও তাদের মিডিয়া সিন্ডিকেটকে আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই: প্রেস ফ্রিডম মাস্ট কাম উইথ রেসপনসিবিলিটি। যাই হোক, হলুদ সাংবাদিকতা ও এজেন্ডা সাংবাদিকতা পরিহার করে দল-মত নির্বিশেষে পাঠকপ্রিয়তা অর্জনের সুযোগ এখনো তাদের আছে বলে আমরা মনে করি। আর যদি তারা এখনো নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শিক গোষ্ঠীর প্রিয় পত্রিকা হিসেবে থাকতে চান, তাতে আমাদের বলার কিছু নেই। তাদের মূল্যায়ন করবেন মহামান্য পাঠকরাই।